Thursday, November 15, 2012

রামু ও রাঙামাটির ঘটনা - প্রতিমা ভাঙেনি, ভেঙেছে আস্থা ও বিশ্বাস


মহিউদ্দিন আহমদ | তারিখ: ১৬-১১-২০১২
গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কী? বেশি ভোট পেয়ে ‘নির্বাচিত’ হলেই ‘সবকিছু আমার’, এটা ভাবতেই পছন্দ করেন আমাদের রাজনীতিকেরা। গণতন্ত্র মানেই ‘সংখ্যাগুরুর শাসন’! গণতন্ত্রে পরীক্ষা হয় সংখ্যালঘুর প্রতি সংখ্যাগুরুর আচরণের মধ্য দিয়ে। আমরা এ পরীক্ষায় এখনো পাস করতে পারিনি। রামুর সাম্প্রতিক ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, এ দেশ সংখ্যালঘুরা কত বিপদের মধ্যে আছে, কত অসহায় তারা। সংবিধানের সেক্যুলার তত্ত্বে যাঁরা বুঁদ হয়ে আছেন, তাঁরাও এটা বুঝতে অক্ষম যে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা এ দেশে মোটেও নিরাপদ নয়। 
এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে বা হয়েছে, তার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তিনটি কারণে এ ধরনের সহিংসতা ঘটেছে। ১. বিএনপি-জামায়াতের উসকানি, ২. রোহিঙ্গা জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা এবং ৩. জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। বিএনপি পাল্টা পাটকেলটি ছুড়েছে। তারা দায়ী করেছে আওয়ামী ষড়যন্ত্র এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে। বিএনপি এখানেই থেমে থাকেনি। তারা রকেটের গতিতে একটি দলীয় তদন্ত কমিটি বানিয়ে তদন্ত রিপোর্টও তৈরি করে ফেলেছে এবং তা তাদের ‘প্রপার চ্যানেলে’, অর্থাৎ বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। একটি মানবিক বিপর্যয় নিয়ে এ রকম দলবাজি এবং কাদা ছোড়াছুড়ি আমাদের দেশেই সম্ভব!
‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন, কেষ্টা ব্যাটাই চোর।’ তো এই ‘কেষ্টা’ কে, তা বের করতে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীদের এক সেকেন্ডের বেশি সময় লাগেনি। রোহিঙ্গাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ আছে। মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গার ইতিহাস পুরোনো। আরাকান অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দাঙ্গায় অনেক রোহিঙ্গা হতাহত হয়েছে, ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে মিয়ানমারের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সব মানুষ একজোট হয়ে মুসলমানদের ওপর হামলা করছে। গণমাধ্যমের সৌজন্যে আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, তা হলো এই, মিয়ানমারে জাতিগত বিদ্বেষের সুযোগ নিয়ে কিছু লোক দাঙ্গা বাধিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী হয় সহযোগিতা করেছে, অথবা নিষ্ক্রিয় থেকেছে। রাখাইন-অধ্যুষিত এই অঞ্চলে রোহিঙ্গারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। ওই রোহিঙ্গাদের মনে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু কক্সবাজার জেলায় কয়েক হাজার রাখাইন বসবাস করলেও তারা কেউ আক্রান্ত হয়নি। এ দেশে আক্রান্ত হয়েছে বাঙালি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ ও তাদের মন্দির। যারা আক্রমণ করেছিল, তারা দলীয় পরিচয়ে এবং দলের প্রয়োজনে দাঙ্গা বাধিয়েছে, এটা প্রমাণ করা কষ্টকর। তাদের মধ্যে কমবেশি সব দলেরই ভোটার ছিল। তবে নিঃসন্দেহে তারা সবাই ছিল ‘মুসলমান’। তাদের ‘ধর্মীয় জোশ’ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা ‘বিধর্মীদের’ আক্রমণ একটি দায়িত্ব মনে করেছিল। ১৯৯২ সালে হিন্দু মৌলবাদীদের হাতে বাবরি মসজিদ আক্রান্ত হওয়ার পরপর বাংলাদেশের অনেক জেলায় হিন্দুদের মন্দির পোড়ানো ও লুটপাটের ঘটনা এখনো স্মরণ আছে। ‘চোখের বদলে চোখ’— প্রতিহিংসাপরায়ণতার এই সংস্কৃতি আদিম ও বর্বর সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য; আমরা এখনো ওই পর্যায়ে আছি। 
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আপাতদৃষ্টিতে দুই সম্প্রদায়ের মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু এখানে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকে না। একদল লোভী ও অসৎ মানুষের পরিকল্পনায় পতঙ্গের মতো বুঝে বা না বুঝে ঝাঁপ দেয় আরও অনেকে। আক্রান্ত জনগোষ্ঠী যদি ছোট ও দুর্বল হয়, তাহলে দাঙ্গা হয় একতরফা। এ ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছে। রামুতে একদল দাঙ্গা বাধিয়েছে, আরেক দল মানুষ মার খেয়েছে। মন্দিরে শুধু বুদ্ধ প্রতিমা ভাঙেনি, ভেঙে গেছে একটি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও আস্থা। শুধু পুঁথিপত্র পোড়েনি, পুড়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত একটা সম্প্রীতি ও সমন্বয়মূলক গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। একাত্তরের টালমাটাল দিনগুলোতেও এ ধরনের নির্মমতার শিকার হয়নি এ দেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়। ‘স্বাধীন’ দেশে এ কোন ধরনের বর্বরতা। 
১৯৫৪ সালে আদমজী জুটমিলে বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে দাঙ্গা হয়েছিল। এ কে ফজলুল হকের যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়ার পটভূমি তৈরি করেছিল এই দাঙ্গা। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে দাঙ্গা হয়েছিল। ঢাকার রায়েরবাজারে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ হয়েছিল। হাজার হাজার ‘হিন্দু’ ভিটেমাটি ছেড়ে দেশান্তরি হয়েছিল। রায়েরবাজারকে ‘মুসলমান’ বানানো হয়েছিল অতঃপর। এর নাম এখন জাফরাবাদ। একাত্তরে গণহত্যার অবশ্য কট্টরপন্থী পাকিস্তানিদের কাছে বাঙালি মাত্রেই ছিল হিন্দু এবং ভারতের দালাল। ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন এ দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক সদস্য। ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, কিছুই বাদ যায়নি। সর্বশেষে রামু ও উখিয়াতে যা ঘটে গেল, তা একই প্রবণতার ধারাবাহিকতা।
আমার দৃঢ়বিশ্বাস, রাষ্ট্রের মদদ ছাড়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানো সম্ভব নয়। ওপরে উল্লিখিত প্রতিটি ঘটনায় রাষ্ট্রের বা তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইন্ধন ছিল। জমি দখল, দোকান লুট বা দখল এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘরছাড়া করে নির্বাচনের ময়দান দখল করা। এ জন্য সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে ভোটব্যাংক নিরাপদ রাখার ছলচাতুরী একটি পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল।
রামুর ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করতে দেরি হয়নি। পাকিস্তান আমলে দেখেছি, কায়েমি স্বার্থের ধ্বজাধারীরা ২৪ বছর ধরে চিৎকার করে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ফেরি করেছে এই বলে যে পাকিস্তান শিশু রাষ্ট্র, একে ভাঙার ষড়যন্ত্র চলছে। ইসলাম বিপদাপন্ন। বাংলাদেশ হয়েছে ৪০ বছর হলো। এখনো বাংলাদেশ শিশু রাষ্ট্র, গণতন্ত্র বিপদাপন্ন। এই রাজনীতি চলবে কত দিন?
ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য সরকার আছে, আছে নানা নামের ও রঙের গোয়েন্দা সংস্থা। এরা যদি ষড়যন্ত্রের আঁচ না পায়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিতে পারে, তাহলে জনগণের খাজনার টাকায় তাদের পুষে লাভ কী? 
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পেছনে সংখ্যাগুরুর সভিনিজম ছিল অনেকাংশে দায়ী। আমাদের জাতীয় পর্যায়ের ছোট-বড় প্রায় সব নেতা এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন যে মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্র চাই। পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পর সভিনিজমের রথযাত্রা থেমে যায়নি। জায়গা করে নিয়েছিল পাঞ্জাবি সভিনিজম। ফলাফল একই। আবার দেশভাগ। ’৭২ সাল থেকে যে পথযাত্রা শুরু হলো নতুন করে, তা-ও মসৃণ হয়নি। ‘বাঙালি মুসলমান’ এখন চালকের আসনে। তার সভিনিস্ট পরিচয় দিন দিন উজ্জ্বলতর হচ্ছে। এটা মোটেও কাম্য ছিল না। আমরা নিজেরা নিজেদের ঘরে যতই লাফঝাঁপ দিই না কেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের মুখ দেখানোর জো নেই। ঢাকার রাজপথে ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও আফগানিস্তানের মানবাধিকার নিয়ে মিছিল হয়। কিন্তু দেশের ভেতরে সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিষয়ে আমরা উদাসীন। আমরা আমাদের কাজকর্মে বারবার এটা প্রমাণ করে চলেছি যে বাংলাদেশ বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র হওয়ার বদলে বাঙালি মুসলমানের জাতীয় রাষ্ট্র হয়েছে।
রামুর ঘটনা হয়তো ঠেকানো যেত, যদি আগেকার দাঙ্গাবাজদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা যেত। রামুর ঘটনার মাস খানেক আগে এর ড্রেস রিহার্সেল হয়েছিল রাঙামাটিতে। গণমাধ্যমের একটা বড় অংশ যদিও এটাকে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ হিসেবে হেডলাইন করেছিল, আদতে ঘটনা তা ছিল না। রাঙামাটিতে পাহাড়ি-বাঙালি মিলেমিশে বাস করছে অনেক বছর ধরে। কতিপয় ফন্দিবাজ মানুষ রাঙামাটি কলেজে দুই ছাত্রের মধ্যে ঝগড়ার গল্প রটিয়ে একটা অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা ঘটানো যায় না। এক ঘণ্টার মধ্যে দেখা গেল, বেছে বেছে শুধু পাহাড়িদের দোকানপাটে আক্রমণ হলো। হোটেল ও ক্লিনিকও বাদ গেল না। পাহাড়িদের মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হলো। কোনো বাঙালির দোকানে আক্রমণ হয়নি। এখানে একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, ‘সমঝে চলো, নইলে বিপদ আছে’। 
পরে অবশ্য একটা লোক দেখানো ‘শান্তি মিছিল’ হয়েছে। কিন্তু মনের ক্ষত দূর হয়নি। পাহাড়ি কৃষকদের খুচরা বাজার কলেজ গেট থেকে কল্যাণপুরে চলে এসেছে। তবলছড়ির বাজার এখন বসে আসাম বস্তিতে। ১৯৯০ সালের পর আর ঘটেনি। একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষ এটা ঘটিয়েছে। ইংরেজিতে এদের বলা হয় ‘আর্চিন’। এদেরকে লংগদু ও মেরুম (দীঘিনালা) থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল বলে জনশ্রুতি আছে। মূল পরিকল্পনাকারী ও উসকানিদাতা কারা, সেটা এখনো সরকার বের করতে পারেনি। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রলম্বিত বা বানচাল করার উদ্দেশ্যেই এই দাঙ্গার মহড়া দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। রাঙামাটির সহিংস ঘটনার পর সরকার সতর্ক হলে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার ত্বরিত প্রচেষ্টা চালালে হয়তো রামুর ঘটনা এড়ানো যেত।
আমাদের রাষ্ট্রে একজন লিমনের ব্যাপারে যত ‘করিতকর্মা’, এসব দাঙ্গাবাজ ও ফন্দিবাজদের ব্যাপারে ততটাই উদাসীন। বড় রাজনৈতিক দলগুলো বৃহদাকার মুসলমান ভোটব্যাংকের ব্যাপারে এতটাই বেপরোয়া, সংখ্যালঘুদের নিয়ে তাদের চিন্তা নেই। ‘ওরা তো আছেই।’ আমাদের রাষ্ট্র যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের মুখে গণতন্ত্রের জিগির যে কতটা অভিনয় ও অন্তঃসারশূন্য, তা রাঙামাটি আর রামুর ঘটনাবলি আবারও প্রমাণ করল। একটা উগ্র জাতীয়তাবাদী জাতি হিসেবে আমরা আবার আমাদের পরিচিতি জানান দিলাম। কেবল বিবৃতি, মানববন্ধন আর মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে এই ক্ষতের নিরাময় হবে না।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।

mohi2005@gmail.com

No comments:

Post a Comment