Thursday, January 17, 2013

বৌদ্ধপল্লিতে হামলা সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের ধরতে মানা


কামরুল হাসান ও আব্দুল কুদ্দুস, কক্সবাজার থেকে | তারিখ: ১৭-০১-২০১৩
রামু চৌমুহনী থেকে বাঁয়ে ঘুরে কেন্দ্রীয় সীমা বৌদ্ধবিহারের দিকে দুই কদম এগোতেই চোখে পড়ে নতুন টিনের ছাউনি। সীমা বিহার পর্যন্ত বাঁ দিকে সব বাড়ি ও সীমানাদেয়ালেও নতুন টিন। তাতে লেখা, ‘বিজিবি কর্তৃক নির্মিত’। 
গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে হামলার সময় এসব ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। সরকারি অর্থে ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
আরেকটু দূরে কেন্দ্রীয় সীমা বিহার। সেদিনের ভস্মীভূত সীমা বিহারের স্থানে এখন উঠছে ৮০ ফুট উচ্চতার বিশাল মন্দির। দিনরাত কাজ চলছে। জনা চারেক সেনাসদস্য নির্মাণকাজ তদারক করছেন। 
বিহারের মাঠে ঢুকতেই এগিয়ে এলেন আবাসিক পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু। নির্মিত ভবনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সবকিছু ভালোই চলছে। সরকারি অর্থে নতুন নতুন মন্দির হচ্ছে। আপাতত সবাই খুশি। কিন্তু বৌদ্ধদের মনের ভেতরে ক্ষত এখনো রয়েই গেছে।’
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুর মতো ক্ষোভ অনেক বৌদ্ধনেতারই। তাঁদের প্রশ্ন, চোখের সামনে যারা মন্দিরে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে, মিছিল-মিটিং করেছে, তারা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর নিরীহ লোকজনকে ধরে ধরে পাঠানো হচ্ছে কারাগারে। এতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর দুই দিক থেকেই চাপ ও ক্ষোভ বাড়ছে। 
কক্সবাজার পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও আসামিদের ঘুরে বেড়ানোর কথা প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের ধরতে মানা। ওপরের চাপে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের তাঁরা গ্রেপ্তার করতে পারছেন না। আবার যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৪০ জন ইতিমধ্যে জামিনে বেরিয়ে এসেছেন।
গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে হামলা চালিয়ে রামুর ১২টি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও ৩০টির বেশি বসতবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফে আরও সাতটি মন্দির ও ১১টি বসতিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় ১৯টি মামলায় ১৫ হাজার ১৮২ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত এসব মামলায় ৪৬৮ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এঁদের মধ্যে রামু থানায় দায়ের করা মামলার আসামি ৩২৩ জন, বাকিরা উখিয়া ও টেকনাফ থানায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। 
জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার করা আসামিদের মধ্যে ২১ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। স্বীকারোক্তি থেকে পুলিশ হামলায় জড়িত ৮৬১ জনকে শনাক্তের পর ৪৫৩ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এঁদের মাত্র ১০ শতাংশ বিএনপি ও জামায়াতের সদস্য। বাকিরা সাধারণ মানুষ। সরকারি দলের কোনো নেতা-কর্মীকে এখনো পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি। আর ফেসবুক ব্যবহারকারী সেই উত্তম কুমার বড়ুয়ার এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি। 
শনাক্ত হলেও গ্রেপ্তার নেই: রামুতে হামলার পর ঘটনা তদন্তে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. নুরুল ইসলামকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটির প্রতিবেদনে ২০৫ জন হামলাকারীকে শনাক্ত করা হয়। এঁদের মধ্যে ৪২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাকিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। 
কমিটির প্রতিবেদনে ২ নম্বর অভিযুক্ত নুরুল ইসলাম ওরফে সেলিম। তিনি উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক। প্রথম আলোকে তিনি মিছিল করার কথা স্বীকার করলেও হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন।
কমিটির প্রতিবেদনের ৫ নম্বর অভিযুক্ত সাদ্দাম হোসেনও ছাত্রলীগের নেতা। ৭ নম্বরে আছেন আনসারুল হক ওরফে ভুট্টো। তিনি উপজেলা মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি। তাঁর ছোট ভাই ছাত্রলীগের কর্মী রিদোয়ানের নাম আছে ২০৩ নম্বরে। রিদোয়ানের বিরুদ্ধে মন্দিরের দান বাক্স লুটের অভিযোগ আছে। 
প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের তালিকায় ১৫ নম্বরে আছেন ইউনুছ রানা চৌধুরী। তিনি উপজেলা জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক। জানতে চাইলে ইউনুছ রানা বলেন, ‘আমি তো হামলাকারী না, পুলিশ কেন আমাকে গ্রেপ্তার করবে?’ তালিকায় ছাত্রলীগের কর্মীদের মধ্যে আরও আছেন ৮ নম্বরে কাউসার আখতার, ১৮৮ নম্বরে দেলোয়ার হোসেন। 
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহেল সরওয়ার বলেন, বৌদ্ধমন্দিরে হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগের কেউ জড়িত নয়। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে দলের নেতা-কর্মীদের অভিযুক্ত করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। 
তদন্ত প্রতিবেদনে ছাত্রদল নেতাদের মধ্যে ১১৫ নম্বরে নাম আছে আবদুল আজিজ ও ১৪০ নম্বরে আতিকুল হক। বিএনপি-সমর্থক মিজান মেম্বরের নাম ১৪১ নম্বরে। বিএনপি-সমর্থক ইটভাটার মালিক মোজাফফর আহমেদ ওরফে মোজাফফর কোম্পানির নাম আছে ১০১ নম্বরে। তাঁর ছেলে শফিউল কবিরের নাম ৭৭ নম্বরে। 
জামায়াত নেতাদের মধ্যে আজগর আলীর নাম আছে ১২৬ নম্বরে। শিবির নেতা ও ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের ছোট ভাই সাইফুল ইসলামের নাম আছে ১০৫ নম্বরে। আরও আছেন আমিন উদ্দিন, হাবিবুল্লাহ, রমজান আলী, হাফেজ ইসমাইল, মাওলানা হাকিম, আবদুল্লাহ, কামাল উদ্দিন। তালিকার ১০৭ নম্বরে আছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) পিয়ন আফসার মিয়ার নাম। 
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযুক্তরা কী করে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে—জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. আজাদ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘তালিকার নাম বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। কমিটির কোনো প্রতিবেদনও আমরা পাইনি।’ 
যাঁরা জামিন পেলেন: জেলা পুলিশ জানায়, রামুর ঘটনার পর ইতিমধ্যে ৪০ জন জামিন পেয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জন উখিয়া ও রামুর মামলার আসামি। আর আছেন ফেসবুক ব্যবহারকারী উত্তম বড়ুয়ার মা আদু বড়ুয়া ও তাঁর বোন মাধু বড়ুয়া।
জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে জেলা জামায়াতের নেতা ও উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজালাল চৌধুরীও আছেন। তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। 
তদন্তে সমস্যা: জেলা পুলিশ সুপার মো. আজাদ মিয়া জানান, রামুর ঘটনায় এখন সাক্ষ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন কাউকে শনাক্ত করতে সহায়তাও করছেন না। 
কেন সাক্ষ্য দিচ্ছেন না জানতে চাইলে রামু বৌদ্ধ ঐক্য কল্যাণ পরিষদের আহ্বায়ক তরুণ বড়ুয়া বলেন, ‘ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তাদের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ আছে। সবার তালিকা পুলিশের কাছে দিয়েছি। পুলিশ সেসব তালিকা ধরে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু ধরা হচ্ছে না।’
বৌদ্ধ ভিক্ষু সুনির্মল বড়ুয়া বলেন, যারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের নাম বলার সাহস মানুষ হারিয়ে ফেলছে।
৩০০ বছরের পুরোনো ‘লালচিং’ বৌদ্ধবিহারের ভিক্ষু ওয়েছেকা ছারা মহাথের (৮৭) বলেন, ‘এ ঘটনার তিন মাস পরও হিসাব মেলাতে পারছি না যে গৌতম বুদ্ধের মূর্তি, মন্দির ধ্বংস করে কার লাভ হলো।’
মূল হোতারা অজানাই থেকে গেল: রামুর ঘটনায় তদন্ত, অনুসন্ধানের পরও মূল হোতাদের চিহ্নিত করা যায়নি। এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরএসও এবং জামায়াতের নেতারা এ ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন। কিন্তু এখন কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। তবে আরএসওর সাধারণ সম্পাদক সালামত উল্লাহ ঘটনার দিন কক্সবাজারে উপস্থিত ছিলেন। 
হোতাদের শনাক্ত না করার ব্যাপারে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. বাবুল আক্তার বলেন, মামলায় অভিযুক্ত কয়েকজন আসামি আত্মগোপনে থাকায় আটক করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে হামলার মূল রহস্য ও হোতাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। ফেসবুকের সেই উত্তম বড়ুয়াকেও খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।
সরেজমিন সবার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, রামুর মানুষ হতাশ ও উদ্বিগ্ন। এখন তাঁরা মামলা নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে চান না। তাঁদের বক্তব্য, শতকোটি টাকা খরচ করে এখন কি আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া বৌদ্ধদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ফিরে পাওয়া যাবে? 
বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন জেলা শাখার সভাপতি বঙ্কিম বড়ুয়া ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, নতুন মন্দিরের ভেতরেও পোড়া মন্দিরের ক্ষত থেকে যাবে আজীবন।


No comments:

Post a Comment