Friday, November 2, 2012

চর্যাপদের বাংলা ভাষার কাছে মৌলবাদীদের পরাজয়


লিখেছেনঃ  সোনা কান্তি বড়ুয়া Sunday, 28 October 2012 16:28
ছবি: সোনা কান্তি বড়ুয়া

টরন্টো, বিগত ১৩ই এবং ১৫ই অক্টোবর ২০১২ কানাডায় বসবাসকারী বাঙলাদেশের নাগরিকগণ সহ বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধগণ সম্মিলিত ভাবে বাংলাদেশে বৌদ্ধ মন্দিরে উগ্র ইসলামী মৌলবাদীদের হামলার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন এবং প্রতিবাদ জানিয়েছেন টরন্টো শহরের কেন্দ্রস্থল নাথন ফিলিপস সেন্টার, মন্ট্রিয়াল শহরের সিটি সেন্টার এবং কানাডার রাজধানী অটোয়ায় সংসদ ভবন (পার্লিয়েমেন্ট হিল) প্রাঙ্গনে। মানুষের চেয়ে নহে কিছু বড়, নাই কিছু মহিয়ান।
মম লেখা কবিতা এবং প্রবন্ধ কহে
সব মানুষের রক্তে সত্যের (আল্লাহ,ঈশ্বর) প্রবাহ বহে ।
আমার ভাইয়ের বসতি জ্বালানো ২৯ শে সেপ্টেম্বর
আমি কি ভুলিতে পারি, হে করুনাঘন জগদীশ্বর!
ইসলাম নাম ধরি ২৫ হাজার জঙ্গীদের প্রচন্ড অন্যায়
মানব বৌদ্ধ জনপদ বিহার ধ্বংস করে বলের বন্যায় ।
হে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কথা বল তুমি
রামুর বড়য়াদের বসতি পোড়ায় জঙ্গী ইসলামী।
বেহায়া ধর্মান্ধ ইসলামী জঙ্গীদের নিল্লর্জ অমনুষতা
হাহাকারে ধূলিজালে ক্ষুভিল স্বাধীনতা।
কবিতায় গল্পে শহীদুল্লাহ নজরুল বুদ্ধের জীবনী পড়ে,
ইসলামী জঙ্গীরা কেন বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করে?

শত মায়ের চোখে শুধু ভয় হয়
কখন বৌদ্ধ বিহারে জঙ্গীদের আক্রমন হয় ?
বিহারে বিহারে কাঁদিছে উপাসক ভন্তেকে খোঁজ করি
বুদ্ধ মন্দিরে বাজেনাক ঘন্টা সকাল সন্ধ্যা ভরি।
       বোধিঘর সে ধ্বংস যজ্ঞে ভরা, সোনার প্রদীপ লয়ে,
     বুদ্ধ পূজায় ভয় হয় উপাসিকার, বুদ্ধ বন্দনা কয়ে।
     বিহারের আঙিনায় শিউলি কুড়াইতে চোখে আসে জল,
     বৌদ্ধ বিহারে ধ্বংসযজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধের কি কর্মফল ?
     ভাঙা বৌদ্ধ বিহার আবার গড়িব, আসুন ভন্তে ফিরি,
     শক্তহাতে আমরা তাড়াবো ইসলামী জঙ্গীদের গলা ধরি।
আমি লিখি বৌদ্ধবিহারে ইসলামি জঙ্গিদের আক্রমন
বুদ্ধের বাংলাদেশ মনে রেখো, হে ইসলামি মৌলবাদীগণ।
আমি একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ থেকে কথা বলি
আমি হিংসা উন্মত্ত মধ্যরাত্রি থেকে আওয়াজ তুলি।
জঙ্গিরা হোলি খেলেছিল আমার বৌদ্ধ বিহারে
ধর্মান্ধরা বৌদ্ধ জনপদে আগুন জ্বালিয়ে নেচেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ জাগ্রত দ্বারে আমার, আমি মহাশান্তি মহাপ্রেম
আমি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কথা বলি
আগুনের ভিতরে আজ পরশ মনির নেই লেশ
বৌদ্ধ বিহারের ছায়ায় বুদ্ধের আশির্বাদ অশেষ।
পুলিশ যারা চুপ ছিল, যারা সব দেখে ও কিছুই দেখেনি
জঙ্গিদের সব ষড়যন্ত্র জেনেও বৌদ্ধ জনতাকে রক্ষা করেনি।
মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে রাষ্ঠ্রশক্তি জনতার দান
জঙ্গিরা সবাই তালেবান মানবতার কি অবসান?
ওরে ভয় নাই আর
জয় বাংলা জনতার।

ইতিহাসের গতিপথে বৌদ্ধগণ মৃত্যুর পর মৃত্যু পেরিয়ে বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে পারবে কি? ২৬০০ বছর পূর্বে গৌতমবুদ্ধ বগুড়ার মহাস্থানগড়ে তাঁর শান্তির ধর্ম বাংলাদেশের জনতার কাছে প্রচার করেছিলেন। তিনি চর্যাপদে বাংলা ভাষার জনক এবং বাংলা বিশ্বকোষের (১৩শ ভাগ, ৬৫ পৃষ্ঠা) মতে, রাজপুত্র সিদ্ধার্থ (বুদ্ধ) তাঁর ছেলেবেলায় বঙ্গলিপি অধ্যয়ন করেন। প্রাচীনকালে ব্রাহ্মণ্যবাদী দলিত শাসনের বিকৃতির হাত থেকে গৌতমবুদ্ধ বঙ্গলিপিকে (বিভিন্ন লিপিসহ) ব্রাহ্মণদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন (দেশ, কোলকাতা, ১ ফেব্রয়ারি, ১৯৯২)।    ঐতিহাসিক নানা কারনে ভারতে জাতিভেদ প্রথার উদগাতা ব্রাহ্মণ্যবাদের হাতে জাতিভেদ প্রথা বিরোধী বৌদ্ধদের মৃত্যু অবধারিত ছিল। তারপর মৌলবাদী জামাত ধর্মের আগুনে করুন রোদনে তিলে তিলে বাংলাদেশের বৌদ্ধগণ ক্ষয় হচ্ছে দিনের পর দিন।  
ইসলামি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ জাগ্রত দ্বারে। বৌদ্ধ বিহার ধ্বংসযজ্ঞ তো নিশ্চয়ই বাংলাদেশের জাতীয় লজ্জা এবং ইসলামি মৌলবাদীরা বান্দরবানের বনজঙ্গল নিয়ে আরেকটা পাকিস্তান মার্কা স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গোপন মিশন চলছে (টরন্টোর বাংলা কাগজ, অক্টোবর ০২, ২০১২)। সারা রাতজুড়ে সম্প্রতি ইসলামী মৌলবাদীরা ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরে রামু , উখিয়া এবং পটিয়ায় বৌদ্ধ বিহার এবং বড়য়া বৌদ্ধদের ঘরবাড়ী সমূহে আগুন দিয়ে হরিলুট এবং ধ্বংসযজ্ঞ করে মানবতাকে কবর দিয়েছে।

বাংলা ভাষার কাছে মৌলবাদীদের পরাজয়
বাংলাদেশের জনতা সহ আমরা কি ত্রিশলক্ষ শহীদের বিনিময়ে ও স্বাধীনতার মুখ দেখবো না? এক সাগর রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল রাজাকার সহ দেশের কতিপয় সেনাশাসকগণ। বাংলাদেশে মৌলবাদীধর্মের জামাতগোষ্ঠি ও রাষ্ঠ্রক্ষমতার সাহেব বিবি গোলামদের দুর্নীতির জাঁতাকলে পিষ্ঠ ৪০ বছরের স্বাধীনতা। জনতার পেটে ভাত না থাকলে ধর্ম বা স্বাধীনতার মূল্যায়ন করা কঠিন কাজ। ক্ষুধা শাসকের চেয়ে ও বেশী শক্তিবান।
বিভিন্ন বিশ্ব রাজনৈতিক কারন সহ ইসলাম ধর্মের নামে বাংলাদেশে উর্দু ভাষা  পাকিস্তানের মতো রাষ্ঠ্রভাষা করতে না পারায় বাংলাদেশকে কোন মুসলমান দেশ ভারত এবং ভূটানের আগে স্বীকৃতি তো দিল না এবং আজকের মৌলবাদীদের স্বাধীন ইসলামী রাষ্ঠ্র  প্রতিষ্ঠার গোপন মিশন ১৯৭১ সালে কোথায় ছিল? বাংলা ভাষায় জয়কে মনে মনে ইসলামী মৌলবাদী এবং আল কায়দা বৌদ্ধধর্মের জয় মনে করে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি কে অনেক বোম মেরেছে। আলোকিত ভাষার বর্ণমালা বুদ্ধমূর্তিকে বোম মারার কর্মফল ভয়াবহ। বুদ্ধমূর্তি বিরাজমান অধর্ম হলে, মুসলমানদের অফিসে বঙ্গবন্ধুর ছবি (সৌদী আরবের বাদশাহের ছবি, খোমেনীর ছবি) এবং গৃহে কাবাগৃহের (মক্কার) ছবির কি হবে? জাতীয় পতাকাকে সালাম করার অর্থ কি? বৌদ্ধধর্মে মূর্তি পূজা নেই। বৌদ্ধধর্মের ভাষায় জীবন পঞ্চস্কন্ধের যোগফল, যথা : (১) রুপ (২) বেদনা (৩) সংজ্ঞা (৪) সংস্কার এবং (৫) বিজ্ঞান (কনসিয়াসনেস)। গভীর ধ্যানের মাধ্যমে জীবন রহস্যের সমাধান করার সহজ ব্যাখ্যা বাংলা ভাষার প্রথম বই চর্যাপদে বিরাজমান।
জামায়াতের কাছে বাংলাদেশ রাষ্ঠ্রশক্তির মস্তক অবনত ছিল কেন? ধর্ম ও স্বাধীনতা শব্দকে অপব্যবহার করেছেন দেশের প্রশাসনের সাহেব বিবি গোলামগণ। আজ ও ধর্মকে তরোয়ালের মতো ব্যবহার করে রাষ্ঠ্রক্ষমতা, আলেম সমাজ ও জামাত জনতাকে ক্রীত দাস বানিয়ে তাঁদের স্বাধীনতা হরণ করে রাতের আঁধারে ২৫ হাজার মৌলবাদীগণ রামু, উখিয়া এবং পটিয়ায় ৫৫ বৌদ্ধ বিহারে এবং ৬৫ বড়য়া বৌদ্ধগণের ঘর বাড়ী জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ করেছে।  
সর্ব শক্তিমান আল্লাহ সব ধর্মে নানা নামে বিরাজমান। ইসলামী মৌলবাদীরা কি বৌদ্ধ বসতিকে ধ্বংস করবে ? ইসলামী মৌলবাদীগণ রামু, উথিয়া ও পটিয়ায় বৌদ্ধগনের বৌদ্ধ বিহার এবং ঘরে আগুন দিয়ে ধ্বংস যজ্ঞ করেছে রাতের পর রাত। রামুর বৌদ্ধ জনপদে ইসলামী জামাতুল মুজাহীদ সহ জঙ্গীরা ধর্মের নামে লোভ লালসা এবং হিংসার আগুনে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্ঠির সবশ্রেষ্ঠ জীব অনুভূতি ত্যাগ করে রাক্ষস হয়ে প্রচন্ড অন্যায় কাজ করেছে।
আগামী ২০২৫ সালে বুড়িগঙ্গা, (দৈনিক ডেস্টিনি, ২১ শে মার্চ, ২০০৮) সহ বাংলাদেশের নদ-নদীর অস্তিত্ব শেষ করে জামাতুল মুজাহিদিনদের মরুভূমি মার্কা ধর্মের ভূমিতে আরো কত শত বোমা বিস্ফোরিত হবে কে জানে? বাঙালির রক্তে নানা জিনঘটিত অনেক অদ্ভুত ব্যাপার আছে। ইমপ্রিন্টস অব সেনসেটিভ সোল আমাদের স্বাধীনতাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। অতীশ দীপংকর (৯৮২ - ১১৫৪) তিব্বতে যাবার পর বিদেশি বল্লাল সেনের জাতিভেদ প্রথায় নির্যাতীত বাংলাদেশে বকতিয়ার খিলজি ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাষ্ঠ্রক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। বাঙালি ঐতিহাসিক ও শিল্পীর মন বাঙালির স্বাধীনতা (১১৫৪ - ১৯৭১) আন্দোলনের বিভিন্ন ইতিহাস জনমানসে উপস্থিত করার প্রয়াস করেছিল যথেষ্ঠ উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে।
গণ প্রজাতান্ত্রীক বাংলাদেশে বৌদ্ধ জনতা এমন অমানবিক আক্রমন মৌলবাদী ইসলামের  নামে মেনে নিতে পারেন না। বেআইনি রাজনীতির বিরুদ্ধে জনতা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষনা করবেন। বৌদ্ধ জনতা মরে গেলে দেশ কি শুধু ইসলামী মৌলবাদীদের জন্যে? দেশের কুলি, ছাত্র, ছাত্রী, মজদুর ও কৃষকগণ মরে গেলে ও ভিআইপিদের টাকা বানানোর জন্যে ধর্মের রসের হাঁড়িতে রাজনীতি ভারী মজাদার হয়ে ওঠেছে। বাঙালির ধর্ম ছিল, আছে এবং থাকবে, অহিংসা পরম ধর্ম। মহাকবি নজরুল ইসলামের ভাষায়, মানুষের চেয়ে নহে কিছু বড় / নাই কিছু মহিয়ান। মানবতাবাদী (আশরাফুল মাকলুকাতের) বাংলাদেশে আদিবাসী সহ জগত জুড়িয়া এক জাতি আছে, সেই জাতির নাম মানুষ জাতি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে ধর্ম, নারী ও মানুষকে নিয়ে রাজনৈতিক পাশা খেলা বন্ধ করতে হবে এবং হজযাত্রীর নামে সউদিতে উগ্র মৌলবাদী পাচার হচেছ। (যায় যায় দিন, ফেব্রয়ারী ২০, ২০০৮)।
স্বাধীনদেশে রাষ্ঠ্রক্ষমতার প্রথম ও প্রধান কাজ জনতাকে মানবিক মর্যাদায় বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা। বাংলা মায়ের চরনতলে স্বর্গ বিরাজমান। আধুনিক বাংলাদেশে মুসলমান না হলে বড়ূয়া বৌদ্ধদের কি বেঁচে থাকার অধিকার নেই? ২৫ হাজার ইসলামি জঙ্গিগণ সম্মিলিতভাবে বৌদ্ধ বিহার, ঘর বাড়ী এবং দোকানে আগুন দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ করার সময় আইনের শাসনের রক্ষক পুলিশ প্রশাসন কিছুই করলো না। মনুষ্যত্ব বা মানব শিশুর সংজ্ঞা কি শুধু মুসলমান? আমাদের শক্তি মেরে, তোরাও বাঁচবি নারে। ইসলামি জঙ্গিরা কি বৌদ্ধদের অস্তিত্ব বিলোপ করতে চায়?   বিশ্বের প্রথম বাংলা বই চর্যাপদের মতে, বাংলা ভাষার জনক গৌতমবুদ্ধ, বৌদ্ধ পাল রাজাগণ ৪০০ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশের শাসক ছিলেন এবং বাংলাদেশ বাঙালি বৌদ্ধদের দেশ। আমার বাপের ঘরে আগুন দিল কে রে, আমি খুঁজিয়া বেড়ায় তারে। নানা যন্ত্রনায় ৮ শত বছর বাংলাদেশের অনেক প্রাচীন বৌদ্ধগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলেন।
প্রসঙ্গত: হাজার বছর যাবত হিন্দুমৌলবাদীগণ বৌদ্ধহত্যা যজ্ঞের পর বুদ্ধগয়া দখল করার মাধ্যমে রাজা শশাঙ্ক ৬৫০ সালে বোধিবৃক্ষ ধ্বংস করে মহাবোধি মন্দিরের ভেতর শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠায় হিন্দু মন্দিরে পরিনত করেছিলেন। বৌদ্ধদের সীমাহীন পরিশ্রম ও অহিংস মুক্তিযুদ্ধের পর ভারতের সুপ্রীম কোর্টের রায়, বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মন্দিরের মালিক হিন্দুরা নয়, বৌদ্ধগণই উক্ত মহাবোধি মন্দিরের প্রকৃত মালিক (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১২)। বিশ্ববৌদ্ধদের ধর্মীয় অনুভূতির মূলে কুঠারাঘাত করিয়াছে (বুদ্ধ পূর্ণিমা, ৬ই মে ২০১২ সালে) আনন্দবাজার পত্রিকার কার্টুনে লেখা ছিল, হ্যাঁ রে আজ না কি বুদ্ধ পূর্ণিমা? বলিস কী, এখন ও নাম বদলায় নি। নাম বদলানোর ইতিহাসে হিন্দুরাজনীতি বৌদ্ধধর্মকে হাইজ্যাক করে হিন্দুধর্ম বানিয়েছে এবং বৌদ্ধদের বোধিসত্ত্ব তারাদেবীকে (চর্যাপদে নৈরাত্মা দেবী) দূর্গা বানিয়ে দূর্গা পূজায় হিন্দুধর্মের মহিমা প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের জনৈক অভিজ্ঞ লেখকের ভাষায়, গান্ধী গেছেন গুলির মধ্যে, জিন্না গেলেন মারা, নাজীমুদ্দীন হইছেন রাজা, হিন্দুর দফা সারা, মোমিন মুসলমান। মুখে আল্লারসুল সবে বল। (কোরাস)। কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনার মেজর (অব) এম খায়রুজ্জামান জেল হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। হযরত শাহজালালের মাজারে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর বোমা হামলার পর ১১ বছর হয়ে গেছে, ওই বোমা হামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে কি? ইসলামি জঙ্গিদের নবজাগরণ (ভোরের কাগজ, ১৮ আগষ্ট, ২০০৭),  দেশের জন্য অমঙ্গল জেনে ও প্রিন্সিপ্যাল ষ্টাফ অফিসার লে: জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিদের কোন ঘাটি নেই (সম্পাদকীয়, ভোরের কাগজ, ১২ই আগষ্ট, ২০০৭)।
ধর্মকে রাজনীতির হাঁড়িতে মিশে বিষক্রিয়ায় বিগত জোট সরকার বাংলাদেশের সমাজ জীবনের ও ব্যক্তি জীবনের সর্বত্র তালেবান ও আলকায়দা ধর্মকে বিষিয়ে দিয়ে নিজেদের আধিপত্যের শেখড় রাজনীতির গভীরে নিয়ে গিয়েছিল। আইনের শাসনের মাধ্যমে অহিংসা, সত্য, ঈমান, শৃঙ্খলা, পরিশুদ্ধ মন ও মৈত্রীকে মানব সমাজে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল যে কোন ধর্মের উদ্দেশ্য। রাজনীতির বাইরে মানুষের মানবতা বলে একটা জিনিষ আছে, যাহা মানুষের মনুষ্যত্ব এবং আজ মানবাধিকার ভিত্তিক স্বাধীনতায় জনতা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অন্যায়কে কি ইসলামের নাম দিয়ে হালাল করা যায়? বাংলাদেশে তো উর্দূ ভাষাকে ইসলামের নামে হালাল করা যায় নি। জনতার স্বাধীনতা ফিরে পেতে বর্তমান রাজনীতির অভিজ্ঞতায় ইউরোপীয়ান এনলাইটেনমেন্টের আলোকে আলোকিত বাংলাদেশ রচনা করতে জামায়াতের অন্ধকার সাম্প্রদায়িক শক্তির অবসানই একমাত্র পথ। সন্ত্রাসী শিবির ও জামাতের ইসলাম ধর্মে কি মানবাধিকার আছে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেছেন বলে কি দেশের সাবেক রাষ্ঠ্রক্ষমতাধারীরা বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা সহ বন্ধু বান্ধব সবাইকে মেরে ফেলবে?

বৌদ্ধ বিহার ধ্বংসই জাতীয় লজ্জা এবং এর আসামী হাজির:
ধর্ম নামক ভাইরাস এবং রাজনৈতিক দুঃখের দহনে করুন রোদনে তিলে তিলে ক্ষয় হচ্ছে বাংলাদেশে জনগণ। মুসলমান না হলে বাংলাদেশে বৌদ্ধগণ কি মানুষ নয়? আধুনিক ভদ্র সমাজে রাতের আঁধারে বৌদ্ধ জনপদে আক্রমন কি ইসলামের জয়গান করে ? আসল কথা ইসলামিক মৌলবাদীরা বাংলা ভাষার কাছে হেরে গেছে। গানের কথায়,  মোল্লা মার্কা সন্ত্রাসী, চোরাইয়া বুদ্ধমন্দিরে আগুন দিয়ে এবং বুদ্ধমূর্তি চুরি করে মসজিদে ঘুমায়। উক্ত বৌদ্ধমন্দির ধ্বংস যজ্ঞের আসামী আজ ও পুলিশ খুঁজে পাইনি অথচ জনতা চেনেন সেই আসামি রাজপুরুষদেরকে। কড়ির খেলায় দেশের পাত্র মিত্ররা আড়ালে, ফেঁসেছে মুঠোফোনের ভিডিউতে সন্ত্রাসী মুসলমানগণ। বুদ্ধমূর্তিকে বোমা মারা এবং সন্ত্রাস করলেই টাকা। টাকা ওয়ালারা রাজনীতি ও ধর্মের টুপি পরে শরনার্থী মুসলমানদেরকে নিয়ে সন্ত্রাসী আবশ্যকের বাজার খোলে বসে আছে।
সবাই বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস যজ্ঞের আসামিদেরকে চেনে, কিন্তু নাম বলতে অনেকে ভয় পায়। মহাভারতে মহারাজা ধৃতরাষ্ঠ্রের রাজ সভায় রাজ বধু দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের সময় রাজার পাত্রমিত্র সবাই দেখেছে, কিন্তু সেনাপতি গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম পর্যন্ত অপরাধী দুর্যোধনের নাম বলছেন না। হাতী ঘোড়া গেল তল, মৌলবাদীরা কয়, কতজল? তেমনি দেশের সাহেব বিবি গোলামেরা সব জেনে শুনে ভাণ করছেন কিছুই জানেন না। আধুনিক সভ্য সমাজের সংজ্ঞা কি? জন অরণ্যের মৌলবাদী মানুষ নামক পশুরা ধর্মের ছলে দূর্বল বিধর্মী মানুষ নিয়ে পাশা খেলে। কড়ি দিয়ে রাজশক্তির অদল বদল করতে গায়ের জোরে ঈশ্বরের নামে বুদ্ধের গায়ে আগুন লাগায়। মনে যদি সত্য না জাগে, ধর্মের টুপি মাথায় দিয়ে চোখ ভুলানো যায় রে শুধু, মন ভুলানো যায় না আর। শেষ বিচারের আশায়, আমরা বসে আছি।
ইতিহাসের মতে, কর্ণাটকের সেন বংশের রাজাগণ ব্রাহ্মণ্যধর্মের যাঁতাকলে বাংলাদেশের বৌদ্ধগণকে নির্যাতন করেন। তারপর ১২০২ সালে বখতিয়ার খিলজি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা সহ শত শত বৌদ্ধ মন্দির, বিহার এবং বাংলাদেশ জুড়ে বিভিন্ন ধ্বংস যজ্ঞের মাধ্যমে লক্ষন সেনকে পরাজয় করে। ধর্মকে নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগণ সহ তালেবান ও আলকায়দা অমানবিক রাজনীতির জন্য হিংসায় উন্মত্ত হয়ে অপাপবিদ্ধ সাধারণ মানুষদেরকে বোমা মেরে দুঃখের বিষাদসিন্ধু রচনা করে চলার পর শান্তি কি ফিরে আসবে?

বৌদ্ধবিহার ধ্বংসযজ্ঞের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট  
বাংলাদেশে একমাত্র রাষ্ঠ্রদ্রোহী রাজনৈতীক দল জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পরম মিত্র এবং বহাল তবিয়তে ধর্ম ব্যবসায় রাষ্ঠ্রধর্মের অসীম শক্তি নিয়ে বিরাজমান। চলমান ৪০ বছরে ২১ বার রক্তাক্ত সামরিক বিদ্রোহের স্মৃতি নিয়ে জনতার মনে গভীর ক্ষত আজ ও বিদ্যমান। বিগত বিডিআরে বিদ্রোহের নামে সদর দফতর পিলখানায় সত্তরের ও বেশী সেনা কমকর্তা সহ অনেকে হতাহত হওয়ায় জাতি শোকস্তব্দ। শোকাহত বাংলাদেশ। তোমার বদন খানি মলিন হলে / আমি নয়ন জলে ভাসি। বিডিআর তরুন সদস্যদের বিদ্রোহের নামে হত্যাযজ্ঞের পেছনে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না জানতে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চক্রান্ত চলছে, সতর্ক থাকুন।

 লেখক এস বড়য়া, সভাপতি, কানাডা বাংলাদেশ বৌদ্ধ পরিষদ, টরন্টো, খ্যাতিমান ঐতিহাসিক, কথাশিল্পী, বিবিধ গ্রন্থ প্রণেতা এবং প্রবাসী কলামিষ্ঠ।    

প্রধানমন্ত্রীর সাথে সফর প্রত্যাখ্যান করলেন শ্রদ্ধেয় সত্যপ্রিয় মহাথের


লিখেছেনঃ   Friday, 02 November 2012 19:11
প্রধানমন্ত্রীর সাথে সফর প্রত্যাখ্যান করলেন শ্রদ্ধেয় সত্যপ্রিয় মহাথের

সরকারি খরচে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভিয়েতনামলাওস ও কম্বোডিয়ায় সফরসঙ্গী হওয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তা ফিরিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ বৌদ্ধ সংঘরাজ মহাসভার সাবেক সভাপতি ও কক্সবাজারের রামু সীমা বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ সত্যপ্রিয় মহাথের
রামুর ধ্বংস হয়ে যাওয়া ৩০০ বছরের পুরোনো সীমা বিহারের অধ্যক্ষ ৮৪ বছর বয়সী এই প্রবীণ বৌদ্ধ ভিক্ষু সত্যপ্রিয়। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীনা ওয়ার বিষয়ে তিনি একটি জাতীয় দৈনিককে জানানপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাকে সন্মানিত করা হয়েছে তাই আমি প্রধানমন্ত্রীকে আশীর্বাদ করছি। তবে আমি যেতে পারছি না।"
তিনি আরো বলেনসেই বর্বর হামলার ঘটনার ক্ষত এখনো আমার মন থেকে মুছে যায়নি। এ ছাড়া আমি শারীরিকভাবেও অসুস্থ।"
উল্লেখ্যএই রামু থেকে শুরু করে উখিয়া, টেকনাফ এবং পটিয়ায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞচালানো হয় মোট ১৬টি বৌদ্ধবিহার ও মন্দির, এবং শতাধিক বৌদ্ধ বসতিতে
প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়-এ পৌঁছেছেন। তাঁকে সেখানে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়ার মাধ্যমে বরণ করে নেন ভিয়েতনাম সরকার।

বুদ্ধ, অশোক ও আমরা




ওমর শামস | ২০ অক্টোবর ২০১২ ৯:৪৯ অপরাহ্ন
buddha.gif
শরনং গচ্ছামি
ঝ’রেছে তোমার পুণ্য পুন্ড্র হতে হরিকেল দু’হাজার সাল, জানে নাকি বাংলার জন?
হতবাক শুপুরিরা, হায়! – কান্ড স্থির, উড়েছে সকল পাখি – নিস্তব্ধ, বিহবল এখন।
জ্ঞানের-প্রাণের-ধ্যানের – শুদ্ধির এ আগুন নয়, - জ্বলে ধ্বংসের । জরা-মুক্তি পরে,
হে বুদ্ধ! শেখাও- কি ক’রে রক্ত থেকে সমুচ্ছেদ – হিংসা, হনন আর দ্বেষের গঠন?
bakhtiar.gif
বখতিয়ার খিলজির প্রতি
বাহবা! বাহবা! মাত্র সতেরো সৈন্যে মসনদ জিতে গেলে খিলজি বখতিয়ার।১
বাজুতে তাকত ছিল, মানি, - তবু পাওনি ইলম-হক-প্রজ্ঞার সার !
কি ক’রে করলে খুন নিরস্ত্র ভিক্ষুক, পোড়ালে নালন্দার স্তুপাকার পুঁথি ,
সেনাপতি, শোননি সবক প্যারা রসূলেরঃ জ্ঞানলাভে চীনে যাও প্রান্তে দুনিয়ার।
১ বখতিয়ার খিলজি নালন্দা ধ্বংস করেছিলেন।
ashoker-chaka.gif
অশোকের চাকা 
প্রজাগণই আমার সন্তান, উহাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গলসাধনই
আমার একমাত্র উদ্দেশ্য।
 — সম্রাট অশোক
আপনিও হাত দ্যান, — বঙ্গের বৃক্ষরে ধ’রে দিই দৃঢ় ঝাঁকা।
মৃত ডাল ঝ’রে যাবে – কীটদষ্ট মেওয়া যত, পচা অতি পাকা।
পরস্বাপহারী পাখি, — কঠোর, ক্লিন্ন ঠোঁট অন্ধ কোটরে বাস। ঝাঁকা দ্যান,
স্তম্ভ কাত, উড়ুক বিহঙ্গম, সানন্দে গড়াক ফের অশোকের চাকা।

সমৃদ্ধ নগর 'অ্যাংকর'


8:35 pm BdST, Friday, Nov 2, 2012
ঋতি মৃত্তিকা নয়ন

তোমার বার্বি পুতুলটাতো তোমার কাছে খুবই প্রিয়; তুমি ওর সঙ্গে খেলো, কথা বলো, অনেকটা সময় কাটাও ওর সঙ্গে। এখন যদি পুতুলটা নষ্ট হয়ে যায়, কিংবা কেউ যদি তোমার পুতুলটা ভেঙ্গে ফেলে, তাহলে তো তোমার খুব মন খারাপ হবে, তাই না? বার্বি পুতুলটা যেমন তোমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি আমাদের আশেপাশের গাছপালা, ঘর-বাড়ি, ভাস্কর্য সবকিছুই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আমাদের সভ্যতার পুরোনো দিনের যে সব স্মৃতিময় স্থাপনাগুলো আছে, সেগুলো তো আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরকমই একটা সভ্যতার নিদর্শন হল ‘অ্যাংকর’।
খ্রীষ্টপূর্ব ৮০২ সনের দিকে, মানে খ্রীষ্টের জন্মেরও ৮০২ বছর আগের কথা। তখন কম্বুজা ছিল জাভা দ্বীপের সম্রাটের অধীনে। ভাবছো, কম্বুজা, জাভা- এগুলো আবার কোন দেশ? এখনকার কম্বোডিয়া ও তার আশেপাশের দেশগুলোকে তখন একসাথে বলা হত কম্বুজা। আর জাভা হলো ইন্দোনেশিয়ার একটি দ্বীপ। ‘জয়বর্মন’ জাভার রাজার কাছ থেকে কম্বুজাকে স্বাধীন করেন। তারপর সেখানে এক নতুন সাম্রাজ্য স্থাপন করেন, গোড়াপত্তন করেন এক নতুন নগরের- ‘অ্যাংকর’। তিনিই অ্যাংকরের প্রথম রাজা।

ভাবছো, এই অ্যাংকর আবার কেমন নাম? অ্যাংকর আসলে একটা খেমার শব্দ, মানে কম্বোডিয়ান ভাষার শব্দ। বাংলা করলে অনেকটা এরকম হয়- পবিত্র শহর।
রাজা হয়েই তিনি ‘দেবরাজ’ উপাধি গ্রহণ করেন। তখন রাজাদের মধ্যে এরকম একটা রীতি প্রচলিত ছিল, সবাই তার ক্ষমতা ও প্রতাপ অনুযায়ী একটা করে উপাধি গ্রহণ করতেন। দেবরাজ বা জয়বর্মন প্রতিষ্ঠিত এই রাজবংশই পরে খমের বা খেমার নামে পরিচিতি পায়। নবম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দি পর্যন্ত, এই খেমাররা মায়ানমারের (তখনকার বার্মা) পশ্চিম থেকে ভিয়েতনামের পূর্বাংশ পর্যন্ত শাসন করতো। আর খেমার সাম্রাজ্যের রাজধানী-ই ছিল এই অ্যাংকর। অ্যাংকর কিন্তু একদম যা-তা শহর ছিল না; সেই সময়ের সবচেয়ে অভিজাত ও সমৃদ্ধ নগরীগুলোর একটি ছিল এই অ্যাংকর। আয়তনে নগরটি ছিল বিশাল, আর তাতে সেই সময়েই বাস করতো প্রায় সাড়ে সাত লাখ লোক।

এই সমৃদ্ধ নগরীর প্রভাব-প্রতিপত্তি ঠাঁট-বাঁট বজায় ছিল বহু বছর। সবশেষে ১৪৩১ সালে অযোধ্যার রাজার কাছে পরাজিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় অ্যাংকর নগরটি। অযোধ্যা চিনেছো তো? আজকের থাইল্যান্ডেই ছিল অযোধ্যা।

এই কম্বোডিয়ানদের পূর্বপুরুষরা, অর্থাৎ খেমাররাই ছিল পৃথিবীর বন্ধুসুলভ জাতিদের অন্যতম। আর হয়তো সে কারণেই তারা নিজেদের বিলুপ্তি সম্পর্কেও কোনো মন্তব্য করতে চায়নি! অ্যাংকরের বিলুপ্ত হওয়ার কাহিনি তাই এখনো এক বিশাল রহস্যই থেকে গেছে।
খেমার রাজারা তো হিন্দু ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তাই তারা অনেকগুলো হিন্দু মন্দির ও অনেক সুন্দর সুন্দর ভাস্কর্য তৈরি করেন। এগুলোর মধ্যে একটা আবার ছিল ঠিক যেন একটা ফুটন্ত পদ্মের মতো। কী চমৎকার ছিল সেটা দেখতে, একবার ভাবো তো! এই মন্দিরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত যেটা, সেটার নাম অ্যাংকর ওয়াত। মন্দিরটি বানিয়েছিলেন রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ। মন্দিরটি কিন্তু এখনো আছে।

মন্দিরগুলোর দেয়ালের গায়ে তারা খোদাই করেছিল অদ্ভুত সব মূর্তি; অধিকাংশই নৃত্যরত। এই মূর্তিগুলোও তাদের উর্বর চিন্তা ও কল্পনাশক্তির পরিচয় দেয়। তাদের ধারণা ছিল, এই মূর্তিগুলো তাদের আর তাদের দেবতাদের মাঝে সংযোগ স্থাপন করতো।

ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দির দিকে থেরাভাদা বৌদ্ধ সম্প্রদায় ধীরে ধীরে অ্যাংকরে জনসংখ্যায় বাড়তে থাকে। হিন্দুদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমতে থাকায়, অ্যাংকরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের উপরও বৌদ্ধদের প্রভাব বাড়তে থাকে। তাতে অবশ্য খুব একটা সমস্যা হচ্ছিল না, কারো সাথে কারো তো কোনো শত্রুতাও ছিল না; কিন্তু গোল বাঁধলো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সাম্যের নীতির কারণে। জানোই তো, হিন্দু ধর্মে তো বর্ণপ্রথা আছে; হিন্দু ধর্মে চারটি বর্ণ- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। তাদের মধ্যে ব্রাহ্মণদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেশি, তারপর ক্ষত্রিয়দের। বৈশ্যদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল আরো কম। আর শূদ্ররা ছিল একরকম অবহেলিত। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মে তো এরকম বর্ণবিভাজন নেই, সবাই-ই সমান। এ কারণে, অ্যাংকর সম্রাটদের আভিজাত্যে ভাটা পরতে থাকে। অনেক গবেষকের মতে, ধর্মীয় রীতিনীতির বদল হওয়াতেই একসময় সামাজিক ও রাজনৈতিক কলহ ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। যা পরবর্তীতে, অ্যাংকরের সভ্যতার জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। মানে, অ্যাংকরের পতনের এটাও একটা কারণ ছিল।
পশ্চিমের অযোধ্যা আর পূর্বের চম্পা- এই দুই রাজ্য ছিল অ্যাংকরের শত্রæরাজ্য। সবসময়ই তারা ক্ষমতার জন্য একে অন্যের সঙ্গে লড়াই করতো। অনেকের মতে, এই যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ধর্মীয় কলহই অ্যাংকরের ধ্বংসের অন্যতম কারণ। আর ষোড়শ শতকে উত্তর-পূর্ব এশিয়া ও চীনের মধ্যে একটা ‘সমুদ্র চুক্তি’ হয়। এই সমুদ্র চুক্তি এশিয়ার এই সমৃদ্ধ সভ্যতাকে আরো বেশি ভঙ্গুর করে দেয়।

অ্যাংকর নগরের সমৃদ্ধির একটা বড়ো উদাহরণ ছিল নগরটির জলব্যবস্থা। এর নালা, খাল-বিলগুলো প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে উঠেছিল। এই নালা, খাল-বিলগুলোকে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা হত পানি বয়ে নিয়ে আনার জন্য, আর বর্ষার মৌসুমে ব্যবহার করা হত অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে।
তবে ক্রমেই অ্যাংকরের অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। নগরটির জলব্যবস্থাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে। আগে যেখানে জলজ উদ্ভিদ ছিল, পরে সেখানে এমন সব গাছপালা জন্মাতে শুরু করলো, যেগুলো পানিতে বাস করার বদলে উল্টো পানি শুষে নেয়। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় মোটামুটি ত্রয়োদশ শতকেই। সব মিলিয়ে নগরটির অবস্থা বেশ সঙ্গীন হয়ে পড়ে। একদিকে, নগরটির অভ্যন্তরে সমস্যা, পাশাপাশি প্রতিবেশি দেশগুলোর সাথেও একরকম যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। অন্যদিকে প্রকৃতিও যখন বিরূপ আচরণ শুরু করলো, অ্যাংকরের জন্য টিকে থাকা আসলেও বেশ মুশকিল হয়ে পড়লো।

এদিকে যখন অ্যাংকরের এই অবস্থা, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও প্রকৃতি বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। ঐ ত্রয়োদশ শতকেই ইউরোপে শুরু হয় প্রচণ্ড ঠাণ্ডার যুগ; এমনকি গরমকালেও শীত পড়তে থাকে। এই সময়টাকে বলা হয় ‘লিটল আইস এজ’, বাংলায় বললে ক্ষুদ্র বরফ যুগ। এশিয়াতেও প্রকৃতির থাবা পড়ে। চলতে থাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ।  দুর্যোগ, খরার কারণে সম্ভবত এই সময়েই গ্রিনল্যান্ড ও মায়া নগরী ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। এসব কিছুই যেন ‘অ্যাংকর’ রাজ্যেরও শেষ পরিণতির কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
এমনিভাবে নানা কারণে খেমারদের প্রভাব-প্রতিপত্তি দিনদিন কমে যাচ্ছিল। ত্রয়োদশ শতকের শেষদিকে খেমাররাজ অযোধ্যারাজের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হতে শুরু করে। আর চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করলো ১৪৩১ সালে। আর এভাবে অ্যাংকর নগর একরকম ধ্বংসই হয়ে গেল। হারিয়ে গেল এশিয়ার আরেকটি সমৃদ্ধ নগরী অ্যাংকর।

না, শহরটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; নগরটির অনেক স্থাপত্যই এখনো টিকে আছে, সংরক্ষিত আছে। তবে স্থাপত্যগুলো একটি দেশে না, ছড়িয়ে আছে তিন-তিনটি দেশে। বলেছিলাম না, নগরটি অনেক বড়ো ছিল; এখন বুঝলে তো, আসলে কতো বড়ো ছিল শহরটি! স্থাপত্যগুলোর বেশিরভাগই মন্দির। অধিকাংশ মন্দিরই আছে কম্বোডিয়া আর থাইল্যান্ডে। অল্প কিছু মন্দির লাওসে-ও আছে। তবে তো একটু সমস্যা-ই হয়ে গেল; অ্যাংকর নগরী, বা অ্যাংকর সভ্যতা দেখতে চাইলে তোমাকে যেতে হবে একটি নয়, দু’টি নয়, তিন-তিনটি দেশে! তবে সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দিরটি কিন্তু কম্বোডিয়ায়। কেন, ‘অ্যাংকর ওয়াত’ মন্দিরটির কথা না তোমাদেরকে বললাম? ওটা তো কম্বোডিয়াতেই। ওটা তো এখন কম্বোডিয়ার প্রতীকেই পরিণত হয়েছে। অ্যাংকর ওয়াত কম্বোডিয়ায় পর্যটকদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান-ই শুধু নয়, অ্যাংকর ওয়াত কম্বোডিয়ার জাতীয় পতাকাতেও স্থান করে নিয়েছে।

কী, অ্যাংকর সভ্যতার সুন্দর সুন্দর মন্দিরগুলো দেখতে ইচ্ছে করছে, যেগুলোতে খোদাই করা আছে নানা মূর্তি, আর আছে অপূর্ব সব ভাস্কর্য? তবে তো তোমাকে কম্বোডিয়া নয় থাইল্যান্ডে যেতে হবে। লাওসে যদি যাও, তা-ও কিছু দেখতে পাবে। আর যাওয়ার আগে আমাকে নিয়ে যেতে যেনো ভুলো না; শত হলেও, আমি-ই তো তোমাকে অ্যাংকরের খবরটা জানালাম, নাকি?

Thursday, November 1, 2012

Shocked again Buddhists resent releasing of sky lanterns at Ramu 2 days after Prabarana Purnima


Your Right To Know
Thursday, November 1, 2012


Staff Correspondent, Ctg

The Buddhist community yesterday expressed resentment over what they saw as a false display of religious harmony when Awami League leaders and officials of the local administration released sky lanterns in Ramu of Cox's Bazar.
It has been only a month since Buddhists in Ramu witnessed 12 of their age-old temples burnt to ashes and dozens of houses damaged by some Muslim zealots over a Facebook picture of a partly burnt Quran.
In protest at the violence against them, the local Buddhist community this year forbore to celebrate Prabarana Purnima, one of their biggest religious festivals, on October 29. They did not release sky lanterns and float decorated ships on the river.
Yesterday's event irked them. They say the programme hurt their religious sentiments. The people, who had allegedly instigated the devastation, also participated in the programme, local Buddhists said. A few Buddhists also joined the group.
Jyotirmoy Barua Rijon, convenor of Bangladesh Chhatra League, Ramu upazila unit, said they had organised the programme to dispel fear and sorrow among the Buddhist community as well as among other people in society.
The programme was organised at Ramu Khijari High School under the banner of a just floated organisation named "Non-Communal Students Council".
Social activist Shamim Ahsan Bulu, who was present there, told The Daily Star that a large number of Buddhists had gathered outside the school field to see the event.
"I saw many of them express resentment over the event. They were saying, 'Why are they releasing lanterns now when Prabarana Purnima ended two days ago'?"
Some 80 people, including ruling party lawmaker Athein Rakhain, Upazila Parishad Chairman Sohel Sarwar Kajol, Upazila Nirbahi Officer Debi Chanda, Ramu Police Station Officer-in-Charge Gazi Shakhawat Hossain and Ramu Press Club President Nurul Islam Selim, were present at the programme.
Rijon, one of the organisers of the event, said he could not invite all because of a shortage of time. But he had invited all elderly persons from the local Buddhist community, who were not there at the event.
He said that like many others Upazila Parishad Chairman Kajol had advised him on how to organise the programme.
Kajol, however, denied the allegation of supporting the programme. He said some youths of Hazari Kul village had organised the programme. On receiving an invitation, he just attended the programme, Kajol added.
Bijon Barua, a local Buddhist, told The Daily Star that it was an insult to the community. Many others echoed his view.

এক মাস পরে রামুতে


আবুল মোমেন | তারিখ: ০১-১১-২০১

রামুতে অনাড়ম্বর আয়োজনে এবার পালিত হলো প্রবারণা পূর্ণিমা
রামুতে অনাড়ম্বর আয়োজনে এবার পালিত হলো প্রবারণা পূর্ণিমা
২৯ অক্টোবর—ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমরা কয়েকজন পৌঁছাই রামু। এদিন প্রবারণা পূর্ণিমা—তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে ভিক্ষুরা এবার প্রব্রজ্যায় বেরোবেন। তাই বৌদ্ধ জনগণ মন্দিরে প্রার্থনা করবেন, দেশনা শুনবেন এবং শেষে ফানুস উড়িয়ে আনন্দ করবেন। এরপর এক মাস ধরে চলবে শ্রমণদের পোশাক বা কঠিন চীবর দানের আনুষ্ঠানিকতা। 
গত ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত তাদের ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি মন্দির পোড়ানো, ভাঙচুর ও লুণ্ঠিত হলে সমগ্র বৌদ্ধসমাজ প্রথমে ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিত হয়েছে। কিন্তু সাদা চোখেই যখন তারা দেখতে পায়, এতে পূর্বপ্রস্তুতির ব্যাপার ছিল এবং স্থানীয় পুলিশকর্তা ও সামগ্রিকভাবে জেলা প্রশাসনের ঔদাসীন্য/শৈথিল্য/প্রশ্রয় ছিল, তখন তো তাদের পক্ষে একে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মনে একদিকে ভয়, শঙ্কা ও ক্ষোভ কাজ করেছে, আর অন্যদিকে তাদের ভবিষ্যৎ, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভূমিকা এবং প্রশাসন সম্পর্কে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে দেশের নাগরিক সমাজের নানা পর্যায়ের মাথা মাথা ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ঘুরে গেছেন, দেখে গেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন, ঘটনার জন্য ক্ষোভ-দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে বড় দুই দলের নেতৃত্ব নিজেদের দুর্বলতা-দোষ ঢাকার চেষ্টা ও অন্যের গায়ে দোষ চাপানোর কৌশল চালিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে যুগপৎ হতাশ করেছেন এবং তাদের ক্ষোভ, আস্থাহীনতা ও দুর্ভাবনা বাড়িয়েছেন। 
দুই দলের মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার রাজনীতি এবং বর্তমানে জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া থাকার কারণে দেশের অমুসলিম সম্প্রদায়ের মনে এ দল সম্পর্কে সংশয় থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। বিপরীতে আওয়ামী লীগ সহজাতভাবেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও ঘটে যাওয়া অনভিপ্রেত ঘটনার ব্যাপ্তি, গভীরতা ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে যে ধরনের ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল, তা তারা নিতে পারেনি। 
গোড়া থেকেই দোষ ঢাকা ও দোষ দেওয়ার বাজে কৌশলের খেলায় মেতে অপেক্ষাকৃত সহজ কাজকে কঠিন করে ফেলা হয়েছে। সরকার সবটা জোর দিচ্ছে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করে তোলার দিকে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, দলীয় নেতারা এলাকা ঘুরেছেন, নিরাপত্তা বাড়িয়েছেন এবং বৌদ্ধ নেতাদের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক করে ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের পুনর্নির্মাণ ও প্রবারণাসহ সব উৎসব-অনুষ্ঠান যেন চিরাচরিত নিয়মেই হয়, সেটা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। তবু সব রকম প্রতিকারে বা নিরাময়ে কিছু সময় লাগেই, চাপাচাপি চালিয়ে বা তাড়াহুড়া করে এসব ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া কঠিন। 
আমরা গিয়ে দেখলাম রামুর পরিবেশ থমথমে, এক মাস পরেও। পুড়ে যাওয়া, ধ্বংসপ্রাপ্ত, লুণ্ঠিত মন্দিরের যেটুকু আছে, তাতেই পুণ্যার্থী বৌদ্ধ নারী-পুরুষ-শিশুর ভিড় বাড়ছে, পূজা চলছে, দেশনা শুরু হচ্ছে। এর আগে বিকেলে বৌদ্ধরা সমবেত হয়ে এলাকায় স্মরণকালের বৃহত্তম মৌন মিছিল করেছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, নিকটবর্তী প্রায় ১৫টি গ্রাম থেকে ছয়-সাত হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে এতে যোগ দিয়েছেন। উৎসবের দিনে কালো ব্যাজ পরে মৌন মিছিল করার অর্থই হলো, তাঁরা আনন্দ বাদ দিয়ে বেদনা ও ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাতে চেয়েছেন। খোঁজখবর নিয়ে এর তাৎক্ষণিক কয়েকটি কারণ বুঝতে অসুবিধা হয় না— 
এক. নিজেদের ও মানুষের মনের অবস্থা জেনে স্থানীয় ভান্তে ও বৌদ্ধ নেতারা বুঝেছিলেন, এবারে অন্তত রামুতে প্রবারণায় ঐতিহ্যগতভাবে আনন্দ-উৎসব করা যাবে না। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন—বুঝতে অসুবিধা হয় না, সরকারি নির্দেশে বারবার তাঁদের চাপ দিচ্ছিল ফানুস ওড়ানোসহ প্রবারণার সব আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য। ভুক্তভোগী মানুষের মনের অবস্থা বোঝার এবং তা বিবেচনায় নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে উদাসীন থেকে যান্ত্রিকভাবে স্বাভাবিকতা ফেরানোর এই জবরদস্তি স্বভাবতই মানুষের মনের গভীরে সৃষ্ট ক্ষত, শঙ্কা ও হতাশার কোনো উপশম করতে পারে না। 
দুই. জেলার পুলিশকর্তা মহোদয় দুর্ঘটনার রাতের নিশ্চেষ্টতা ও ব্যর্থতা ঢাকার জন্য ঈদুল আজহার শুভেচ্ছাস্বরূপ মন্দিরের ভান্তেদের জন্য মাংস-পরোটাসহ যে আহার্য পাঠিয়েছেন, তাতে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের মানুষের অন্য ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীর সম্পর্কে অজ্ঞতা, সংবেদনশীলতার অভাব এবং যেনতেনভাবে ক্ষমতার দায় মেটানোর চেষ্টারই প্রকাশ ঘটে। সরকারি নির্দেশে, না নিজ বুদ্ধিতে তিনি এ কাজ করেছেন, তা বোঝা মুশকিল। 
তিন. অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ফলে দেশের যে মূল্যবান প্রত্নসম্পদের ক্ষতি হয়েছে, সে সম্পর্কেও কর্তৃপক্ষীয় মহলে যথাযথ সচেতনতার ও সংবেদনার অভাব বোঝা যায়, যখন দেখি এসব বিষয় নিয়ে বৌদ্ধ নেতা ও দেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অনুপুঙ্খ আলোচনার আগেই সামরিক বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় দ্রুততার সঙ্গে স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করা হচ্ছে।
কিন্তু কথা হলো, ফাটলটা কে ভরাবে? কীভাবে ভরাবে? ফাটল যে গভীর হয়েছে তা বোঝা যায় নানাভাবে। 
এক. বৌদ্ধরা প্রবারণার দিনে প্রথার বাইরে গিয়ে কালো ব্যাজ ধারণ করে মৌন মিছিল করেছেন, তাতে ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন এবং তাকে একান্তভাবে সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছেন। এমনকি অন্য ধর্মাবলম্বী পরীক্ষিত বন্ধুদেরও অনুরোধ করেছেন এটিতে যোগ না দিয়ে একে তাঁদেরই বেদনা ও ক্ষোভ প্রকাশে সীমাবদ্ধ রাখায় সহযোগিতা দিতে। 
দুই. চৌমুহনীর মোড়ে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের ব্যানারে যে সম্প্রীতি সমাবেশ আয়োজন করা হয়েছে, তাকে মনে হচ্ছিল একটি বিচ্ছিন্ন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। রামুতে সামনের কদিনে আরও কয়েকটি সম্প্রীতি সমাবেশ যে হবে, তা জানতে পারি দোকানে নতুন নতুন ব্যানারের অসমাপ্ত লেখা পড়ে। কিন্তু সেসব আনুষ্ঠানিকতা স্বেচ্ছাসেবক লীগের চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় আছে। 
তিন. বৌদ্ধ সম্প্রদায় সন্ধ্যা সাতটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যে গণমোমবাতি প্রজ্বালনের অনুষ্ঠান ঘোষণা করেছিল, তা স্থানীয় প্রশাসনের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়। তারা নিশ্চয় নিরাপত্তা নিয়ে ভাবিত ছিল। 
চার. জাতীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উদ্যোগ যে নাগরিক সমাবেশ, ঘোষণা পাঠ ও মোমবাতি প্রজ্বালনের কর্মসূচি নিয়েছিল, যাতে অংশ নিতে আমি গিয়েছিলাম, তা উন্মুক্ত স্থানের পরিবর্তে প্রাচীর ঘেরা স্কুল প্রাঙ্গণে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও ক্ষুদ্র পরিসরে সারতে হয়েছে। বৌদ্ধসহ সব ধর্মের মানুষ এতে যোগ দিলেও বৌদ্ধদের অনুরোধে রামুতে আমরা গান বাদ দিয়েছিলাম। মানুষের মনে যখন আঘাত লাগে, সে মনে নানান মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। তাতে ভয়, শঙ্কা, ক্ষোভ, ক্রোধ, হতাশার মতো অনেক নেতিবাচক ভাব সক্রিয় হয় এবং বৃহত্তর সমাজ ও সরকারের কাছ থেকে সঠিক আচরণ ও প্রতিকার না পেলে তা বাড়ে, পুঞ্জীভূত হয়। 
এ দেশে সেই ১৯৪৬, ১৯৫০ ও ১৯৬৪-এর পরে ঠিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। তবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এবং ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত রাষ্ট্র চলেছে সাম্প্রদায়িক নীতির ভিত্তিতে। এর দ্বারা প্রধানত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হিন্দুসমাজ, তবে তুলনায় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট সম্প্রদায়ও সংখ্যাগুরু মুসলমানের সমান আচরণ রাষ্ট্রের কাছে পায়নি। দীর্ঘকাল ধরে এটা চললেও এবং এর ফলে সংখ্যালঘুর সম্পত্তিহানি ও দেশত্যাগের ঘটনা ঘটলেও মুসলিম সমাজ—রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে—সামাজিক পর্যায়ে এ নিয়ে ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি, তাদের সমব্যথী হয়নি, প্রতিকারের কোনো চেষ্টা করেনি। ফলে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের জন্ম হয়েছে, সংখ্যালঘুদের মধ্যে ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক আচার-অনুষ্ঠান বেড়েছে, ভেতরে ভেতরে মুসলমানদের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। আমাদের রাজনীতি এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে, সংস্কৃতির সার্থকতা অতি সীমিত এবং সংখ্যাগুরুর সঙ্গে অন্যান্য ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের দূরত্ব কেবল বাড়ছে।
সরকারি কাজের কিছু সমালোচনা করছি বটে, কিন্তু এ কাজ শুরু করতে ও চালাতে হবে সমাজকেই। ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর সমাজ বিশেষভাবে সচেষ্ট হলে সর্বধর্মের মানুষের সমন্বয়ে সমাজ পরস্পরকে জানা-বোঝার, পরস্পরের কাছে আসার কাজ করতে পারে। নাগরিক সমাজ থেকে উদ্যোগ শুরু হলে তার প্রভাব পড়বে রাজনৈতিক দলের ওপর, চাপ তৈরি হবে সরকারের ওপর। তখনই শুভ শক্তির জাগরণ হবে আর অশুভ বাতাসের বিকার ক্রমে বন্ধ হতে থাকবে।
আমি শেষ করব নাগরিক সমাজের কাছে চারটি প্রস্তাব রেখে—
১. একটি জাতীয় সম্প্রীতি দিবস ঘোষণা করে সারা দেশে সব ধর্মের সম্প্রদায়ের মানুষ মিলে দিনটি উদ্যাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. প্রত্নবিদ, ইতিহাসবিদ, বৌদ্ধ পণ্ডিত, স্থপতি, পুরকৌশলী, মানবাধিকারকর্মী, সংস্কৃতিকর্মীসহ একটি বিশেষ দল গঠন করে তাদের রামুতে কিছুদিন (অন্তত ১৫ দিন) অবস্থান এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কাজে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিলে দায়িত্ব পালন। সরকারের সঙ্গে এ কাজ নিয়ে যোগাযোগ থাকবে। 
৩. সরকারের উচিত হবে উচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতির নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত কমিশন গঠন। এর মূল উদ্দেশ্য হবে মূল অপরাধী, যারা এ কাজ পরিকল্পনা করেছে, এতে ইন্ধন ও সহযোগিতা দিয়েছে এবং ধ্বংসাত্মক কাজে অংশ নিয়েছে, তাদের শনাক্ত করা। পাশাপাশি এদের বাইরে যারা ঘটনার স্রোতে ভেসে তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় এবং পুলিশ প্রশাসনের নিশ্চেষ্টতার সুযোগ নিয়ে এতে অংশ নিয়েছে, তাদের আলাদা করা। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্নসম্পদ সম্পর্কে একটা অনুসন্ধান চালিয়ে ক্ষতিপূরণের নির্দেশনাও এ কমিশন দেবে। 
৪. মিয়ানমারে চলমান এবং নতুনভাবে ঘটমান রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নৃশংস নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে হবে। পাশাপাশি এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে মানবিক ত্রাণ নিয়ে দাঁড়াতে হবে এবং সরকারকে চাপ দিতে হবে যাতে তাদের যথাযথ কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে মিয়ানমার সরকার এ সমস্যার স্থায়ী মানবিক সমাধানে বাধ্য হয়। 
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

রোহিঙ্গা সমস্যা: তিলের ভেতর লুকানো তাল

ফারুক ওয়াসিফ | তারিখ: ০১-১১-২০১২

রোহিঙ্গাদের অমানবিক দুর্দশা অচিরেই নিরাপত্তা সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে
রোহিঙ্গাদের অমানবিক দুর্দশা অচিরেই নিরাপত্তা সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে ‘রোহিঙ্গা সমস্যা মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যকার ধর্মীয় সংঘাত নয়, এটা হলো নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়। আমাদের খুবই হুঁশিয়ার থাকতে হবে।’ 
—সুরিন পিতসুয়ান, আসিয়ান জোটের সেক্রেটারি জেনারেল 

বিশ্বব্যাপীই সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সংঘাতের ঢল দেখা যাচ্ছে। পূর্ব ইউরোপের বলকান যুদ্ধ থেকে যাত্রা করে ভূমধ্যসাগর তীরের আরব অঞ্চল হয়ে সেই সংঘাত ইউরোপ-আমেরিকায়ও চাঙা হচ্ছে। হিংসার ঢল হালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও পৌঁছেছে। গত জুনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী সাম্প্রদায়িকতায় অনেক প্রাণ গেছে, উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। তারপর আসামে বাঙালি মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা এল। এরপর রামুতে হলো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মস্থানে বর্বর আক্রমণ। এরপর আবারও শিকার হচ্ছে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানেরা। সব কটি ঘটনাতেই কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমস্যাটা তাই নিছক সামাজিক সাম্প্রদায়িকতা নয়, ইতিমধ্যে এটা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট আসিয়ান-প্রধানও সেদিকেই নজর কেড়েছেন।
গত ৩০ অক্টোবর আসিয়ানের সেক্রেটারি জেনারেল সুরিন পিতসুয়ান হুঁশিয়ারি করেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর চলছে অসহনীয় চাপ, যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ। আসিয়ানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই চাপ ও যন্ত্রণা দূর করতে না পারলে ১৫ লাখ রোহিঙ্গা চরম পন্থার দিকে যাবে। তা হলে মালাক্কা প্রণালি থেকে শুরু করে সমগ্র অঞ্চলটিই অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।’ ইতিমধ্যে ব্রিটেনের অর্থপুষ্ট মুসলিম এইড এবং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত এনজিওগুলো রোহিঙ্গা কর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়োজিত। অন্যদিকে সৌদি আরবের মদদে বিক্ষুব্ধ রোহিঙ্গাদের একটি অংশ জঙ্গি প্রশিক্ষণ পাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। 
মালাক্কা প্রণালি দুনিয়ার বাণিজ্যিক চলাচলের উল্লেখযোগ্য অংশ। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগ হলো এই প্রণালি। ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাঘা বাঘা অর্থনৈতিক শক্তি এই নৌপথের ওপর বিপুলভাবে নির্ভরশীল। এই অঞ্চল ঘিরে রয়েছে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ জনসংখ্যার দেশগুলো। খ্রিষ্টান ছাড়া বাকিদের প্রত্যেকেরই জনসংখ্যা শতকোটির ওপর। আবার ভারত মহাসাগরে সামরিক প্রাধান্য বজায় রাখা এবং এশীয় অঞ্চলে চীনকে হটিয়ে প্রাধান্য বিস্তার করা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত উদ্দেশ্য ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মসূচি। 
আসিয়ান-প্রধান আরও বলেছেন, ‘এই অঞ্চলটি সহিংসতার ঝুঁকিতে নিপতিত হলে আসিয়ান ও পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ক্ষতি হবে। ব্যাপারটির অনেক বৃহত্তর কৌশলগত এবং নিরাপত্তাগত পরিণাম রয়েছে।’ সুরিনের শেষ কথাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যকার ধর্মীয় সংঘাত নয়, এটা নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়। আমাদের খুবই হুঁশিয়ার থাকতে হবে।’ (৩০ অক্টোবর, জাকার্তা পোস্ট)
দেশের ভেতরে যা সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সমস্যা, আন্তর্জাতিক স্তরে তা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত হুমকি। মিয়ানমার যে রূপান্তর পর্ব পার করছে, তা এই অঞ্চলের গণতন্ত্রায়ণ থমকে দিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে। দেশটিতে বর্মি প্রাধান্যের বিরুদ্ধে কারেন, কাচিং, মং, চীন, রাখাইনসহ অজস্র জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘ সশস্ত্র লড়াই চলছে। সরকারিভাবে ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বর্মিরা একাই ৫০ শতাংশ। অথচ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদের ৮০-৯০ ভাগের মালিক তারা। এই জাতীয়তাবাদের প্রধান হাতিয়ার হলো থেরাভাদা বৌদ্ধবাদ। দেশটির খ্রিষ্টান, মুসলিম, প্রাণীপূজক ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রতি তাদের অসীম বিদ্বেষ। সু চি নিজেও থেরাভাদা বৌদ্ধবাদী বর্মি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত বই বার্মা অ্যান্ড ইন্ডিয়ায় তিনি লিখেছেন, ‘বৌদ্ধবাদ হলো শ্রেষ্ঠ দর্শন...সুতরাং এর কোনো সংস্কার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি দরকার নেই অন্য কোনো দর্শনকে বিবেচনায় আনা।’ এককথায়, এটাই মিয়ানমারের অধিপতি বর্মি শাসকদের রাজনৈদিক মতাদর্শ। অধিকাংশ বর্মি এর অনুসারী। 
২০০৭ সালের গেরুয়া বিপ্লবে সু চির পক্ষে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বিপুলভাবে রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। গণতন্ত্রপন্থী সেই ধর্মীয় বিক্ষোভ থেকেই সন্ন্যাসীরা বর্মিদের আপন ও শ্রদ্ধাভাজন হয়ে ওঠেন। তাঁরা হয়ে ওঠেন একই সঙ্গে সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা। সু চির বর্তমান জনপ্রিয়তা ও জনভিত্তির খুঁটিও এই সন্ন্যাসীরা। চার মাস ধরে চলা রোহিঙ্গা নির্মূলকরণ অভিযানের নায়কেরাও মোটামুটি সু চি-সমর্থক গণতন্ত্রপন্থী। অথচ ১৯৯০ সালের নির্বাচনেও চারজন রোহিঙ্গা সে দেশের এমপি হয়েছিলেন।
গত জুলাইয়ে সিত্তে শহরে দাঙ্গার শুরু করেছিলেন সু চির দলের এক এমপি। এবারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন গেরুয়া বিপ্লবের নেতারা। এঁদের অন্যতম হলেন সন্ন্যাসী বিরাথু। ২০০৩ সালে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা উসকানোর অভিযোগে ২৫ বছরের কারাদণ্ড হয় তাঁর। পরে রাজনৈতিক বন্দীদের মুত্তির প্রক্রিয়ায় তিনিও ছাড়া পান। তিনি এখন যুব সন্ন্যাসী সমিতির প্রধান। এই সংগঠন অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে একযোগে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারাভিযান চালাচ্ছে, বাধা দিচ্ছে উদ্বাস্তুদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর কাজে। আরেক সন্ন্যাসী নেতা আসিন হতাওয়ারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠাতে বদ্ধপরিকর। সু চি তাঁর ‘বিশেষ প্রিয় নেতা’। তিনি চান, রোহিঙ্গাদের নাৎসি জার্মানির ইহুদিদের মতো করে শ্রমশিবিরে রাখা হোক। উগ্র বৌদ্ধপন্থী বর্মি জাতীয়তাবাদ নিজেদের হিটলারি জার্মানির আর্যগর্বের মতো বিশুদ্ধ বর্মি জাতির স্বপ্ন দেখায়, যেখানে অবর্মি ও অবৌদ্ধরা হবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। এই জাতীয়তাবাদীরা এর আগে মিয়ানমারের চীনা বৌদ্ধদের ওপর বিরাট গণহত্যা চালিয়েছিল। ভোট হারানোর ভয়ে 
সু চিও নীরব। সু চি ও সামরিক জান্তা উভয়ই জাতিগত বিদ্রোহ থেকে দৃষ্টি সরানোয় রোহিঙ্গা কার্ড খেলে চলেছেন। রাখাইন প্রদেশের আরাকান লিবারেশন আর্মিও মনে করে, বর্মিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আগে রোহিঙ্গা বিতাড়নে সরকারকে সহযোগিতা দেওয়া লাভজনক।
মিয়ানমারের নব্য জাগরিত পুরোহিততন্ত্র পাশে পাচ্ছে রাষ্ট্রপ্রশাসন, গণমাধ্যম এবং ব্যবসায়ী শ্রেণীকে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তহবিলপুষ্ট ন্যাশনাল এনডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি এবং কুখ্যাত মার্কিন ধনকুবের জর্জ সরোসের ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউট এদের প্রধান আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক। এরাই মিয়ানমারের ভেতরে ও বাইরে গণতন্ত্রপন্থীদের প্রশিক্ষণ ও তহবিল দিয়ে আসছে। ব্রিটেনের বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকেও একইভাবে সু চির অনুসারীদের শক্তিশালী করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব ইস্ট এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের প্রতিবেদন খোলাখুলি জানাচ্ছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক মিয়ানমারের জন্য কাজ করে যাওয়ায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক কর্মীদের সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাবে।’ 
সুতরাং বর্মি ও রাখাইন উগ্র সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ আর গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের প্রতিশোধস্পৃহার ক্রসফায়ারে বৃহত্তর স্বার্থ জলাঞ্জলি যাওয়ার হুমকিতে। 

দুই.
বুঝতে অসুবিধা হয় না, শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী সু চি সামরিক জান্তার সরকারের সঙ্গে কেনই বা সহযোগিতা করছেন আর কেনই বা মিয়ানমারের অঢেল খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়ার বিনিয়োগের পক্ষে ওকালতিতে নেমেছেন। গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী একই সঙ্গে মিয়ানমার থেকে চীনের প্রভাব ও বিনিয়োগ দুই-ই কমিয়ে ফেলতে চান। খেয়াল করার বিষয়, মিয়ানমারের যে দুটি প্রদেশে এখন জাতিগত সহিংসতা চলছে, দুটিতেই চীনের বিরাট বিনিয়োগ রয়েছে। একটি হচ্ছে, কারেন প্রদেশ, সেখানে চীনা বিনিয়োগে নির্মিত বিরাট এক পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এই প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চীনের কিছু অঞ্চলের জ্বালানি ঘাটতি মেটানোয় অপরিহার্য ছিল। রাখাইন প্রদেশের প্রলম্বিত অশান্তিতে এসবই ভেস্তে যাওয়ার মুখে। 
রাখাইন প্রদেশসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর এলাকা কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের গ্যাস সম্পদে সমৃদ্ধ। চীনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত। এই রাখাইন উপকূল থেকেই গ্যাস ও তেলের পাইপলাইন চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমের ইউনান প্রদেশে যাওয়ার কথা। চীনের জন্য বঙ্গোপসাগরে বের হওয়ার কৌশলগত পথও এটি। রাখাইন প্রদেশের রাজধানী সিত্তে শহরে চীনা তহবিলে বন্দর নির্মাণও চলছে। সম্প্রতি ধ্বংস হওয়া রোহিঙ্গা বসতিও এর কাছেই ছিল। এর উল্টো দিকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার টার্মিনাল। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা প্রসারিত হওয়াজনিত জটিলতাও এই পটভূমির অংশ। 
সুতরাং, রাখাইন প্রদেশ থেকে রামু পর্যন্ত জাতিগত দ্বন্দ্ব উসকে ওঠাকে কেবল সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সমস্যা হিসেবে ভাবার সুযোগ নেই। আসিয়ান-প্রধানও সেই ইঙ্গিতই করেছেন। বিশ্বের দিকে তাকালেও দেখা যায়, জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চল অথবা তেল-গ্যাসের আন্তর্জাতিক পাইপলাইনের আশপাশজুড়েই অন্তহীন সহিংসতা চালু আছে। চালু আছে যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, সামাজিক অসন্তোষ এবং ন্যাটোর সামরিকায়ন। পশ্চিমা সরকার, মানবাধিকার সংস্থা, এনজিওগুলো সেই অঞ্চলেই গণতন্ত্র রপ্তানির জন্য ব্যতিব্যস্ত, যেখানে তাদের মালিকানার দানবীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলো খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ পেতে মরিয়া। জাতি-সম্প্রদায়-পরিবার ও দেশ তাদের চোখে দাবার ঘুঁটি মাত্র। রোহিঙ্গা বনাম রাখাইন দ্বন্দ্বে তাই বাংলাদেশকে যেমন মানবিক হতে হবে, তেমনি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদিভাবে কৌশলী।
ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com